চাঁদনিরাতে

0
155

কল্পনা মিত্র : ঝকঝকে আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। জন্মদিনে বাবার দেওয়া নতুন মোবাইলটা নিয়ে ছাদে এলো শুভ, একটা ছবি তুলবে। ছবি তুলতে বাড়ির গা ঘেঁষা পাশের বাড়ির বাচাল মেয়েটার সঙ্গে চোখাচুখি হয়ে গেল। তোমরা হয়তো ভাবছো যতই চাঁদের আলো থাক সেই আলোতে চোখাচুখি হয় কি করে! নাঃ সরাসরি চোখাচুখি হয়নি হলো মোবাইলে। মেয়েটা মুখের কাছে মোবাইল ধরে কাউকে মেসেজ করছিল তাই মোবাইলের আলোটা ওর মুখে পরেছিল।ওরই মাথার পেছনে ছিল চাঁদটা। ছবি তুলবে বলে চাঁদের দিকে তাক করতে গিয়ে মেয়েটার মুখটা চাঁদের সামনে এলো,মেয়েটা হঠাৎ চোখতুলে তার দিকে তাকালো আর আঙ্গুলের ছোঁয়ায় চাঁদ সহ মেয়েটার তারদিকে তাকিয়ে থাকা মুহূর্তটা ছবি হয়ে শুভর নতুন মোবাইলের গ‍্যালারীতে শেভ হয়ে গেল।মেয়েটা চেঁচিয়ে বললো,-“এ‍্যাই,তুমি আমার ছবি তুললে?শুভ হকচকিয়ে উত্তর দিল -“না,চাঁদের।” মেয়েটা বললো -“ছবিটা আমাকে পাঠাও দেখবো।-“কি করে পাঠাবো?” শুভ প্রশ্ন করলো। -“দাঁড়াও নম্বর দিচ্ছি হোয়াটসঅ‍্যাপে পাঠিয়ে দাও।” মেয়েটা উত্তর দিল।শুভ এখন দ্রুত হাতে ছবিটা এডিট করছে, ক্রোপ করে শুধু চাঁদটাকে কেটে শেভ করতে হবে। মেয়েটার সামনে শুধুমাত্র চাঁদের আর একটা ছবি তোলা যাবেনা ধরা পরে যাওয়ার চান্স আছে। মেয়েটা নাম্বার বলে গেল। শুভ নাম্বার সেভ করলো। মেয়েটা তাড়া দিল -“কি হলো পাঠাও।” শুভ ফাইনালি এডিট করা জ্বলজ্বলে চাঁদের ছবিটা পাঠাতে পারলো। মেয়েটা ছবি দেখে বললো,-“হুম…” পরমুহূর্তে বললো,-“এই শোনো ভুল করেও এখানে মেসেজ কোরো না,এটা কিন্তু মাম্এর নাম্বার।”

শুভ শান্ত প্রকৃতির ছেলে। পড়াশোনাতেও মন্দ নয়।ইঞ্জিনিয়ারিং এর সেকেন্ড ইয়ার। হোস্টেলে থাকে।উইকএন্ডে শনিবার বাড়ি আসে সোমবার ভোর বেলা ফিরে গিয়ে ক্লাস করে। পরেরদিন রবিবার সন্ধ‍্যবেলা ছাদে উঠতে উঠতে পরিষ্কার গলার “চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে ” গানটা কানে আসতেই ফোনের রেকর্ডিংটা অন করে চুপিসারে ওইদিকের পাঁচিলে রেখে ছাদের মেঝেতে লুকিয়ে বসে পরলো। মেয়েটা পাঁচিলে ঠেসান দিয়ে ওদিকে ফিরে মোবাইলে কাকে গানটা গেয়ে শোনাচ্ছে। শুভর মনে হলো আকাশের চাঁদটাও মনোযোগ দিয়েবোধহয় ওর গান শুনছে কানপেতে। মৃদু বাতাসে মেয়েটার চুলগুলো যেন গানের তালে তালে উড়ছে। গান শেষ করে মেয়েটা বললো -“নাও পর পর দুটো গান শোনালাম এবার উঠে পরো, সন্ধ‍্যে বেলায় কেউ শুয়ে থাকে! উঠে পরো আমি ফোন রাখলাম।” শুভ ওখানে বসে বসে মেয়েটার কথাগুলো শুনছিল। হঠাৎ মনে পরলো ফোনের কথা, চট্ করে উঠে দাঁড়ালো সে। ব‍্যাস মেয়েটা দেখে ফেললো,-“এই তুমি আমার গান রেকর্ড করোনি তো?”শুভর আর ফোনটা তোলা হলো না। মেয়েটা বললো,-“বাই দা ওয়ে, তুমি যেন মনে মনে আমার সাথে প্রেম করে বোসো না,সামনের মাসে আমার বিয়ে। এই এতোক্ষণ তাকেই গান শোনাচ্ছিলাম। তোমাকে তো রোজ ছাদে দেখিনা কিন্তু কালকে আর আজকে পর পর দুদিন দেখলাম তাই এই কথাটা পরিষ্কার করে বলে দিলাম বুঝেছো?” শুভ কিছু বলার আগে মেয়েটার কথা আবার শুরু,-“তুমি কি করো?” শুভর উত্তর শুনে মেয়েটা বললো,-” ওঃ!তুমিও স্টুডেন্ট। আমি বিএ ফাস্ট ইয়ার। শশুর বাড়ি থেকে পড়াবে বলেছে কিন্তু আমার ফিঁয়ান্সে বলেছে ‘দূর,বিয়ের পর তোমার পড়তে ইচ্ছে না করলে পড়তে হবে না।’ সত‍্যি বলছি আমার লেখাপড়া ভালো লাগে না, আমার শুধু ডানা মেলে উড়তে ভালো লাগে।” বলেই সে কয়েক পাক বন্ বন্ করে ঘুরে নিল।

শুভ রোজ বাড়িতে ফোন করে। একদিন মা বললেন, -“জানিস তো পাশের বাড়ির সেই বাচাল মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেল। আমাদের নিমন্ত্রন ছিল।গিয়েছিলাম। বেশ ভালো বিয়ে হলো…..”শুভর কি খবরটা শুনে আনন্দ হলো না কি খারাপ লাগলো
বুঝতে পারলো না। রাত্রে বিছানায় শুয়ে মোবাইলে তার ছবি দেখলো,তার গান আর গানের শেষের কথাগুলো শুনলো। এগুলো সেদিন ফোন অফ না করার কারণে তার ফোনে রেকর্ডেড হয়ে থেকে গেছে। চাঁদের আলোয় মেয়েটাকে অপরূপা আর পবিত্র দেখাচ্ছে। চোখদুটো বড়ই মায়া মাখানো আর গানের গলাতেও যেন চাঁদের হাসির বন‍্যা ঝরে পরছে! কি সরল কথাবার্তা! সত‍্যি কথা এতো সরল ভাবে কে বলতে পারে? ষ্পষ্ট কথা বলার জন‍্য যে সাহস লাগে সেই সৎসাহস মেয়েটার আছে মানতেই হলো শুভকে। তবে এই রকম মানুষদের সম্ভবত বাচাল আর পাগল বলা হয়। শুভ তার ছবির ওপর আলতো হাতের স্পর্শ ছুঁইয়ে বোললো,-“তুমি ভালো থেকো সুখে থেকো।”

শুভ ক‍্যাম্পাসেই চাকরি পেয়েছিল।ব‍্যাঙ্গালুরুতে পোস্টিং। চারবছর পর কলকাতায় পোস্টিং হয়েছে। বাবা-মায়ের ইচ্ছে এবার ছেলের বিয়ে দেবেন। সন্ধ্যাের পর একটু পায়চারি করার ইচ্ছায় শুভ ছাদে গেল। কে যেন ডাকলো -“তুমি এসেছো?” চমকে ফিরে তাকালো। -“আমার একটু পরামর্শ লাগবে।”
-“দেবো পরামর্শ।তার আগে বলো কেমন আছো।”
শুভ এখন অনেক সাবলীল। বয়স আর চাকরি জীবন ওকে সাবলীল করে তুলেছে।
-” ভালো আছি,তবে তিন মাস সেপারেশনে থাকার পর আজ আমার ডিভোর্সটা হয়ে গেল।”
আকাশ থেকে পরার মতন চমকে উঠলো শুভ,
-“তোমার অপরাধ?”
–“আমি বাচাল সেটা সকলেই বলে হয়তো তুমিও তাই ভাবো। আমি অশিক্ষিত …আমাকে শোকেশে সাজিয়ে রাখা যায়,লোক সমাজে নেওয়া যায় না। আচ্ছা আমাকে তো বলাই যেতো ‘পড়াশোনা করো ‘আমি কি তাহলে পড়াশোনা ছাড়তাম? শোনো আমি পড়াশোনা করতে চাই…কাউকে বলতে পারছি না। তোমার নাম্বার আমার কাছে ছিল ভেবেছিলাম তোমাকে মেসেজ করবো। আজ তোমাকে দেখলাম তাই সরাসরি বলে ফেল্লাম। আমার কোন বন্ধু নেই যাকে মনের কথা বলতে পারি…হয়তো তারা ভাববে এই বয়সে আবার পড়াশোনা কি হবে! বর খোরপোশ দিতে চেয়েছিল নিইনি। তাই নিয়ে এখানে অশান্তি। আমি কিছু শিখতে চাই। আমাকে কিছু পরামর্শ দাও।”

শুভ ওর নাম্বারে হোয়াটসআ‍্যাপে সেই চাঁদনি রাতের আসল ছবিটা পাঠালো। লিখলো আমি তো আছি।তোমার আর তোমার লেখাপড়ার ভার আমি নিলাম। তোমার চিন্তা নেই। তবে তুমি যেমনটি তেমনি থেকো। তুমি আসলে বাচাল নও তুমি চাঁদের মতই উজ্জ্বল এক সরল আর সাহসী মেয়ে। আমি প্রথম দিন থেকে তোমাকে পছন্দ করেছি,আসলে সেদিন থেকেই হয়তো তোমাকে খুব ভালোবেসে ফেলেছি।

Google search engine

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here